ঈদের এখনো কয়েক দিন বাকি। ঘরমুখো মানুষের মূলস্রোত এখনো পথে নামেনি। এর পরও রাজধানী থেকে বের হওয়ার প্রধান সড়কপথগুলোতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। চালকদের আশঙ্কা, কর্তৃপক্ষ সাধ্যমতো যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে যানজট আরো তীব্র হবে এবং মানুষকে রাজধানী ছাড়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। কালের কণ্ঠ’র নিজস্ব প্রতিবেদক পার্থ সারথি দাস, ওমর ফারুক, সরোয়ার আলম, রফিকুল ইসলাম, তায়েফুর রহমান ও প্রতিনিধি এস এম শাহাদাত গত শনিবার রাতে এবং গতকাল রবিবার সরেজমিন ঘুরে দেখেছেন খানাখন্দ, যত্রতত্র পার্কিং ও অতিরিক্ত গাড়ির চাপে নগরীর বহির্মুখগুলোতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।

অগ্রিম টিকিটে প্রথম আজ বাসযাত্রা শুরু হচ্ছে। আগাম টিকিটে গতকাল ট্রেন যাত্রা শুরু হয়, নৌপথে শুরু আগামীকাল। তবে গতকাল দিনভর সরেজমিন ঘুরে কালের কণ্ঠ’র প্রতিবেদকরা দেখেছেন, রাজধানীর ভেতরও গাড়ির চাপ ছিল প্রচণ্ড। মৌচাক-মালিবাগ উড়াল সেতু, মহাখালী উড়াল সেতু, মেয়র হানিফ উড়াল সেতুতেও দুপুরে দেখা গেছে প্রচণ্ড যানজট। এ থেকে উত্তরণে নতুন করে কোনো উদ্যোগ গ্রহণের প্রস্তুতিও নেই।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিল্লাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা রাস্তা মেরামত করতে আগেই উদ্যোগ নিয়েছি।
তবে বর্ষণের কারণে কাজ করেও শতভাগ ফল মিলছে না। ’ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেসবাহুল ইসলাম বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প ও মেরামতকাজ চলছে। এর মধ্যে বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার জন্য রাস্তা পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশ উত্তর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার প্রবীর কুমার রায় বলেন, ‘ঈদের জন্য রাস্তায় গাড়ি বেড়ে গেছে। কোরবানির হাটে পশু পরিবহন শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে যাত্রী পরিবহনও শুরু হয়েছে। মূল চাপ পড়ার আগে থেকেই আমরা সভা করেছি, সেখানে পরিবহন মালিক ও নেতারাও ছিলেন। আমরা মূল সড়ক যানজটমুক্ত রাখতে চেষ্টা করছি। ’ পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক বলেন, ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো বিষয়েই সমন্বয় লক্ষ করা যায় না। সড়কমন্ত্রী উদ্যোগ নিলে সমন্বয়সভা হয়। অন্য কেউ এ ব্যাপারে আগ্রহী নয়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, মহাসড়কে যানজটের চেয়ে রাজধানী থেকে বের হওয়াই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। মহাসড়ক জোড়াতালি দিয়ে ঠিক করা হচ্ছে। কিন্তু ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের রাস্তাঘাট কে মেরামত করবে?
আবদুল্লাহপুর : শনিবার রাত দেড়টা। উত্তরার আজমপুর বাসস্ট্যান্ডের সামনে কথা হয় বগুড়াগামী একতা এক্সপ্রেসের সুপারভাইজার রমজান আলীর সঙ্গে। রাস্তার দুই পাশেই তীব্র যানজট। রমজান আলী জানান, রাত সাড়ে ১২টায় মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে বাস ছেড়ে আজমপুর আসতে সময় লেগেছে এক ঘণ্টা। আবদুল্লাহপুর-টঙ্গী বাজার পাঁচ মিনিটের রাস্তা। কিন্তু তাঁদের লেগেছে পৌনে এক ঘণ্টার মতো। এনা পরিবহনের সহকারী রহিমউল্লাহ জানান, আবদুল্লাহপুর গোলচত্বরটি পাড়ি দিতেই লাগে ৪৫ মিনিট। শনিবার রাত দেড়টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করার পর গতকাল সকালে গিয়েও দুপুর ১টা পর্যন্ত উত্তরার জসীমউদ্দীন রোড থেকে টঙ্গী বাজার পর্যন্ত প্রচণ্ড যানজট। সারি সারি বাসের সঙ্গে গরুবাহী অনেক ট্রাকও যানজট বাড়াচ্ছিল। ট্রাফিক পুলিশ আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েও পরিস্থিতি বাগে আনতে বেগ পাচ্ছিল।
রাস্তায় কর্মরত একাধিক ট্রাফিক ইন্সপেক্টর কালের কণ্ঠকে জানান, ধউড় সেতু থেকে কামারপাড়া সড়ক পর্যন্ত সড়ক বিভাজন না থাকায় ওভারটেক করে যানবাহনগুলো। এ জন্য যানজট চলে আসে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত। কামারপাড়া থেকে ট্রাক, বাসসহ বেশ কিছু যানবাহন গাজীপুর স্টেশন রোডের দিকে এবং কিছু আবদুল্লাহপুরের দিকে আসে। আবদুল্লাহপুর হয়ে আশুলিয়া বাইপাইলের দিকে অনেক যানবাহন চলে যায়। গাজীপুর স্টেশন রোডে যদি যানবাহন প্রবেশ করতে না পারে, তাহলে যানজট সহজে কমবে না। তাঁরা আরো জানান, চার লেনের সড়ক পেরিয়ে টঙ্গী সেতুতে গাড়ি দুই লেনে পড়ে। এ কারণেও গাড়ির গতি মন্থর হয়ে যানজট দেখা দেয়। এ ছাড়া আবদুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ডের সামনে অসংখ্য বাস কাউন্টার রয়েছে। দূরপাল্লার বাসগুলো এসে থামার পরপরই রাস্তায় প্রচণ্ড যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে সোহাগ ও গ্রিন লাইন পরিবহনের বাস থামছে বেশি। তা ছাড়া কেয়া, ঈগল পরিবহন, এস আর পরিবহন, একতা এক্সপ্রেসসহ একাধিক কম্পানির বাস বেশি আসা-যাওয়া করে। সোহাগ পরিবহনের একাধিক যাত্রী জানায়, আবদুল্লাহপুর থেকে আশুলিয়া বাজার পর্যন্ত যেতেই দেড় ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। ভাঙাচোরা রাস্তার কারণেও যানজট বাড়ছে উল্লেখ করে আবদুল্লাহপুর মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক কনস্টেবল মামুন বলেন, ‘গাড়ির চাপ বাড়ছে। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি যানজট নিয়ন্ত্রণে রাখতে। ’
গাজীপুরের যানজট নিয়ে চিন্তিত পুলিশের উত্তর ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারাও। তাঁদের মতে, গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত যানজট এবারের ঈদে ঘরমুখো মানুষদের আরো বিড়ম্বনার মধ্যে ফেলতে পারে। কারণ এ যানজটের পরিধি দীর্ঘ হয়ে চলে আসে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিকের উত্তর বিভাগের উপকমিশনার প্রবীর কুমার রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, রাস্তায় যানবাহনের চাপ বেশি। এর পরও যানজট নিরসন করতে ট্রাফিক পুলিশ আপ্রাণ চেষ্টা করছে। বিশেষ করে আবদুল্লাহপুরের রাস্তাটি যানবাহনমুক্ত রাখার চেষ্টা চলছে। রাস্তায় কোনো দোকান বসতে দেওয়া হচ্ছে না। এলোপাতাড়ি গাড়িও রাখতে পারছে না কেউ। কেউ আইন অমান্য করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পুুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মহাখালী আন্ত জেলা বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন প্রায় চার হাজার যাত্রীবাহী বাস ছেড়ে যায়। গত ১২ জুন মহাখালী বাস টার্মিনালে আইন-শৃঙ্খলা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত মতবিনিময়সভায় ঢাকা জেলা বাস মালিক সমিতির নেতারা জানান, ঈদের আগে প্রতিদিন মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে এক লাখ ২০ হাজার মানুষ ঢাকা ছাড়বে।
যাত্রবাড়ী : যাত্রাবাড়ী থেকে কাজলা দেড় কিলোমিটার রাস্তা পার হতে দেড় থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যাচ্ছে যানবাহনের। আগামী ঈদে এই দেড় কিলোমিটার রাস্তা নিয়ে চিন্তায় আছেন বাসচালকরা। স্থানীয় লোকজন জানায়, যাত্রাবাড়ী থেকে কাজলা এলাকা পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণের কাজ চলছে দীর্ঘদিন ধরে। যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তের পাশে বিশাল ড্রেনে পানি আটকে আছে। এর পাশেই হানিফ ফ্লাইওভার। মাঝখানে একটি মাত্র লেন। তা-ও খানাখন্দে ভরা। এক গাড়ি যাওয়ার সময় আরেক গাড়ি গায়ে পড়ে এমন অবস্থাই সেখানে। ফলে গাড়ি চলতে পারছে না স্বাভাবিক গতিতে। এ ছাড়া যাত্রাবাড়ী থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত তীব্র যানজটের পেছনে পুলিশের ভূমিকা রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। চালকের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের জন্য ট্রাক আটকে রাখার কারণে দীর্ঘ যানজট হচ্ছে বলেও জানান বাসচালকরা। টাকা বাঁচাতে ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে গিয়েও যানজট বাড়ানো হচ্ছে। ঢাকা-কোম্পানীগঞ্জ-নবীনগর রুটের তিশা এক্সক্লুসিভ (ঢাকা মেট্রো-ব-১৪-৭৪৯৩) পরিবহনের সুপারভাইজার জামাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যাত্রাবাড়ী থেকে সায়েদাবাদের দূরত্ব আধামাইলের মতো। ফ্লাইওভার দিয়ে গেলে এইটুকু পথের জন্য ২৬০ টাকা টোল দিতে হয়। তাই নিচের রাস্তা দিয়ে যাই। ’
গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত যাত্রাবাড়ী থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত ঘুরে দেখা গেছে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া এবং ঢাকাগামী যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। চালক-হেলপাররা জানায়, গত তিন দিন আরো খারাপ অবস্থা ছিল। গতকাল তারা এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যেই কাঁচপুরের সিগন্যাল পেরিয়ে ঢাকায় পৌঁছতে পেরেছে। গত তিন-চার দিন সেখানে তিন থেকে চার ঘণ্টা লেগেছে।
গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হানিফ ফ্লাইওভারের যাত্রাবাড়ীর দিকে ঢাকাগামী যানবাহনের তীব্র যানজট দেখা যায়। কুতুবখালী থেকে শুরু হয়ে যানজট চলে যায় প্রায় শনির আখড়া পর্যন্ত। একই সময় ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন জেলাগামী গাড়িকে যাত্রাবাড়ী থেকে কাজলা এলাকা পর্যন্ত দীর্ঘ লাইন ধরে ধীরে ধীরে চলতে দেখা যায়। চালক ও হেলপারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ চিত্র প্রতিদিনের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকাগামী যেসব গাড়ি গুলিস্তান যায় সেগুলোর বেশির ভাগ ফ্লাইওভার দিয়ে যায়। সায়েদাবাদগামী গাড়িগুলোর বেশির ভাগ যায় ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে। এক চালক জানান, ফ্লাইওভারে টুলের টাকা অর্ধেক হলে বেশির ভাগ গাড়িই যেত ফ্লাইওভার দিয়ে। যানজটও কমত। যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালীর বাসিন্দা শাহাদত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ফ্লাইওভারের কারণে যানজট বাড়ছে। তিনি জানান, দক্ষিণ কুতুবখালীর দিকে ফ্লাইওভার যেখান থেকে শুরু হয়েছে সেখান থেকে এক লেনের গাড়ি চলে। সেই লেনটিও খানাখন্দে ভরপুর। আর সায়েদাবাদগামী বেশির ভাগ বাস ফ্লাইওভার দিয়ে না গিয়ে ওই এক লেনেই গিয়ে থাকে। ফলে এই লেনে যাওয়ার জন্য শনির আখড়া পর্যন্ত দীর্ঘ লাইন হয়ে যায় যানবাহনের। চট্টগ্রাম, সিলেট, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে যেসব গাড়ি ঢাকার দিকে আসে এবং ফ্লাইওভারে যেতে চায় তাদেরও দাঁড়িয়ে থাকতে হয় দীর্ঘ লাইনে।
বাসের চালক ও হেলপাররা জানান, সপ্তাহের শেষ দিকে গাড়ির চাপ আরো বাড়বে। এর মধ্যে যদি খানাখন্দগুলো ইট দিয়ে ভরে না দেওয়া হয় তাহলে ঢাকা থেকে কাঁচপুর পার হতেই চার-পাঁচ ঘণ্টা লেগে যেতে পারে। এক চালক বলেন, ‘পুলিশ চাঁদা নেওয়ার জন্য যদি মহাসড়কে ট্রাক না আটকায় তাহলে যানজট কিছুটা কমতে পারে। ’
গাবতলী-আমিনবাজার : এখানে ওখানে শুধুই গর্ত। ছোট বড় গর্ত ভরাট করা হয়েছিল ইটের সুরকি দিয়ে। ইটের সুরকি দিয়ে ভরাট করা অংশগুলো থেকে ইটসুদ্ধ বের হয়ে আবার গর্ত হাঁ করে আছে। সামনে গর্ত পার হতে হবে বলে ধীরে ধীরে চলতে হয়।
রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালের দিকে যাওয়ার আগে টেকনিক্যাল মোড় থেকেই বড় বড় গর্ত। অটোরিকশার চালক মো. আল আমীন বাসযাত্রী শফিকুল ইসলামকে নিয়ে গাবতলী বাস টার্মিনালে যাবেন। কিন্তু গর্তের কারণে সামনের যানবাহনগুলো এগোতে পারছিল না। আল আমীন কালের কণ্ঠকে বললেন, ‘ঈদের আগেই চাপ বাইড়া গেছে। সামনে যাওন যায় না। ’
গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন স্থানের উদ্দেশে যাত্রীরা ঢাকা ছাড়ছে। তাদেরই একজন যাত্রী মনসুর আলী সাকুরা পরিবহনের টিকিট হাতে নিয়ে গাবতলী বাস টার্মিনালের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মনসুর আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, মোহাম্মদপুর থেকে গাবতলীতে ২০ মিনিটেই আসা সম্ভব, সেখানে আজ লেগেছে দেড় ঘণ্টা। এক গর্ত পার হতেই যেন এক মিনিট লাগে। তাঁর পাশে দাঁড়ানো হানিফ পরিবহনের যাত্রী নিয়াজ মোর্শেদ যোগ করে বললেন, ‘খুলনা যাওয়ার টিকিট পেয়েছি। রাস্তার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, খুলনা যেতে এবার প্রাণ বের হয়ে যাবে। ’
গাবতলী হয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, নবীনগর-চন্দ্রা হয়ে বিভিন্ন গন্তব্যের বাস চলাচল করে। এ বাসগুলোর সঙ্গে এসব পথ ধরেই ঢাকায় আসবে কোরবানির পশুবাহী ট্রাক। কোরবানির পশুবাহী ট্রাক নিয়েও ঢাকায় ঢুকতে গিয়ে বিলম্ব ও অপেক্ষার মুখে পড়তে হচ্ছে ব্যাপারীদের। আমিনবাজারে এসেও পড়তে হচ্ছে গর্তের মুখে। হানিফ পরিবহনের চালক ইনসুর আলী বলেন, ঈদের মূল চাপ শুরু হবে ২৮ আগস্ট থেকে। তার আগেই রাস্তায় যানজট লেগে যাচ্ছে। কল্যাণপুর থেকে গাবতলী হয়ে আমিনবাজার পর্যন্তই লেগেছে দুই ঘণ্টা। শ্যামলী পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রমেশ চন্দ্র ঘোষ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যাত্রীরা যানজটে পড়ছে টার্মিনাল থেকে বের হওয়ার পরই। কারণ রাস্তা ভালো না। একটি বাস নির্দিষ্ট সময়ে ঢাকা ফিরতে পারবে, তাও নিশ্চিত নয়। ফলে আমরা ২০ শতাংশ বাস সংরক্ষণ করে রাখছি সময় সামাল দেওয়ার জন্য। ’ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে রাস্তা মেরামত করেও ফল মিলছে না।
আশুলিয়া : রাজধানীর উপকণ্ঠ আশুলিয়ার নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের জিরানী থেকে গাজীপুরের চন্দ্রা পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গতকাল রবিবার সকালে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। ট্রাফিক পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা, প্রত্যক্ষদর্শী ও যানবাহন শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সকাল থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় গাড়ির চাপ বাড়তে থাকে। মূলত টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকায় মহাসড়কটিতে যানজট থাকায় কখনো কখনো তার প্রভাব এসে পড়ে আশুলিয়ার ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ডিইপিজেড) পর্যন্ত। প্রতিটি যানবাহনকে ধীরগতিতে চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকা অতিক্রম করতে হয়। বগুড়াগামী যাত্রীবাহী বাসের চালক শাজাহান মিয়া বলেন, চাপ এখনো তেমন বাড়েনি। তাতেই চন্দ্রা পর্যন্ত যেতে কয়েক ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে। অবস্থার উন্নতি না হলে ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার পর গরুর ট্রাক ও যানবাহন চরম ভোগান্তিতে ফেলবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) ঢাকার একজন নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, আশুলিয়ার জামগড়া, বগাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় একটু বৃষ্টি হলেই সড়কে পানি চলে আসে। সৃষ্টি হয় খানাখন্দের। তবে সাভার ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক আবুল হোসেন বলেন, বৃষ্টি আর সড়কের উভয় পাশের খানাখন্দের কারণে যে সমস্যা দেখা দিয়েছে, তা সাময়িক। চন্দ্রা এলাকায় কোনো ঝামেলা না হলে আসন্ন ঈদে সাভার এলাকায় যানজটের কোনো সম্ভাবনা নেই।
তবে গতকাল রাজধানীর গাবতলী থেকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নবীনগর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত আসতে যানবাহনগুলোর খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি।
ট্রাফিক পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, জামগড়া এলাকায় সড়কের উভয় পাশের বিভিন্ন কারখানা ও বিপণিবিতান সড়ক থেকে বেশ উঁচু। এ কারণে বৃষ্টি হলেই সেখানে পানি জমে। পানির কারণে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়।
বুড়িগঙ্গা সেতু : গুলিস্তান থেকে বাবুপুরা ব্রিজের দূরত্ব ২.৫ কিলোমিটার। গুগল ম্যাপের নির্দেশনা অনুযায়ী, মাইক্রোবাস কিংবা বাসে এই দূরত্ব অতিক্রমে সময় লাগার কথা ১২ মিনিট। হেঁটে গেলে লাগতে পারে ৩১ মিনিট। তবে বাস্তবে এখন লাগছে এক ঘণ্টারও বেশি। বুড়িগঙ্গা-১ (পোস্তগোলা) ও বুড়িগঙ্গা-২ (বাবুবাজার) সেতু দিয়ে রাজধানী থেকে দক্ষিণাঞ্চলের দিকে সড়কপথে যাওয়ার সময় তীব্র যানজটে পড়তে হচ্ছে। প্রধান কারণ অবৈধ পার্কিং ও রিকশার আধিপত্য। গুলিস্তান থেকে বাবুবাজার ও দোলাইপাড় থেকে পোস্তগোলা ব্রিজ পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশেই চলে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং। রয়েছে খানাখন্দও। পোস্তগোলা ব্রিজ হয়ে যেতে সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা জুরাইন রেলগেট মোড়ে। রাস্তা ভাঙার পাশাপাশি রয়েছে অবৈধ গাড়ি পার্কিং। ব্রিজের মুখে টিকিট কাউন্টারও যানজট বাড়িয়ে তুলছে। ব্রিজের ওপারে রাস্তার ধারেই বসেছে কোরবানির গরুর হাট। পশুবাহী গাড়িগুলো ব্রিজে যানজট বাড়াচ্ছে। বাবুবাজার সেতুমুখী রাস্তার খারাপ অবস্থা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কদমতলী এলাকায়। ভাঙা রাস্তায় গাড়ির চাকা অর্ধেক ডুবে যায়। যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তানের ফ্লাইওভারে নিচের সড়ক ও শহীদ ফারুক সড়কেরও বেহাল। ফ্লাইওভার চালুর পর সিটিং সার্ভিস বাস ছাড়া বড় অংশই এখনো নিচের সড়ক দিয়ে চলাচল করে। রাস্তার দুই পাশে অবৈধ গাড়ি পার্কিং চলার পথ রুদ্ধ করে।
নয়াবাজার মোড় থেকে ডান দিকে যেতেই বাবুপুরা ব্রিজ। সকাল সাড়ে ১০টায় যানজটে একটি গাড়িও নড়ছে না। বাবুপুরা ব্রিজে প্রবেশের প্রায় ৫০ মিটার দূরে বাঁ পাশের রাস্তায় ছোট ছোট পিক-আপ ভ্যান ও ট্রাক ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। আর পাশ দিয়ে এগিয়ে চলছে ঢাকা থেকে মাওয়া রুটে চলাচলকারী ইলিশ পরিবহনের একটি বাস। চালক শরিফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে জানান, যানজটের কারণে এগোনো যাচ্ছে না। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই দ্যাখেন না, রাস্তার পাশে গাড়ি ভিড়াইয়া রাখছে। রাস্তার অর্ধেক অংশই গাড়ি পার্কিং করা। ’ ওদিকে বুড়িগঙ্গার ওপারে চুনকুঠিয়া চৌরাস্তা মোড়েও রাস্তার বেহাল!
রূপগঞ্জ : ঈদুল আজহা সামনে রেখে গাড়ির চাপ বাড়ায় পাঁচ থেকে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত যানজট ছড়িয়ে পড়েছে রূপগঞ্জের এশিয়ান হাইওয়েতে (বাইপাস)। গতকাল সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, রূপগঞ্জে কাঞ্চন সেতুর টোল আদায়ে ধীরগতি ও কোরবানির পশুবাহী ট্রাকের কারণে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাঁচপুর থেকে হারভেস্ট গার্মেন্ট পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার এলাকায় যানজট হচ্ছে।
কাঞ্চন টোল প্লাজা ঘুরে জানা গেছে, চারটি টোল বসানো থাকলেও লোকবলসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে মাঝেমধ্যে দুটি টোল বন্ধ রাখা হয়। অতিরিক্ত টোল আদায় করার অভিযোগে টোল আদায়কারীদের সঙ্গে চালকদের বাগিবতণ্ডাও যানজট বাড়াচ্ছিল।
এশিয়ান হাইওয়ে (বাইপাস) নামে সড়কটির প্রস্থ অনেকটা কম। এখানে যানবাহন বিকল হয়েও যানজটের কারণ হচ্ছিল। গাজীপুরগামী ট্রাকচালক রহম আলী অভিযোগ করে বলেন, কাঞ্চনে অতিরিক্ত টোল আদায় করা হয়, সেতু মেরামতেরও কোনো উদ্যোগ নেই। সেতুর অনেক অংশে পিচ ঢালাই উঠে বড় বড় গর্তে পরিণত হয়েছে। ট্রাকের চালক ছমির উদ্দিন, রহিম মৃধাসহ আরো অনেকের অভিযোগ, কাঞ্চন সেতুতে অতিরিক্ত টোল আদায়ের ঘটনাই যানজটের অন্যতম কারণ।
কাঞ্চন সেতু প্রকল্প ও টোল প্লাজার পরিচালক মোহাম্মদ কারিবুল ইসলাম বলেন, সেতুতে এখন চাপ বেশি পড়ে। ৩০০ ফুট রাস্তা ও এশিয়ান হাইওয়ে দিয়ে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে। মাত্র দুটি টোল দিয়ে টোল আদায় করা হয় বলে সময় লেগে যায়। টোল বেশি নেওয়ার অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, আসলে অনেকে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে টোল কম দিতে চায়। তিনি আরো বলেন, যানজট কমাতে ১৫ জন আনসার চাওয়া হয়েছে নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাছে। আশা করা যায়, কাঞ্চন সেতু এলাকা যানজটমুক্ত থাকবে। আর যানজটমুক্ত রাখতে সেতু প্রকল্পের পক্ষ থেকে যথাযথ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হবে।
নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আলিউল হোসেন জানান, ‘টোল আদায়ের কারণে যানজট হচ্ছে, সেটা আমার জানা নেই। ’ নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আশফিয়া সুলতানা বলেন, ঈদের পর কাঞ্চন সেতুর মেরামতকাজ শুরু হবে। এ সময় সেতু দিয়ে যান চলাচল বন্ধ রাখতে হবে। ট্রাফিক পুলিশের ইন্সপেক্টর ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আমার সঙ্গে মাত্র একজন কনস্টেবল দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদস্য বাড়িয়ে দেওয়া হলে যানজট নিরসন করা সম্ভব হবে। ’
রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইসমাইল হোসেন বলেন, প্রায় সময়ই কাঞ্চন সেতু এলাকা থেকে যানজট সৃষ্টি হয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে, যা নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়।